Sunday, May 19, 2024

বঙ্গমাতা পাশে থাকাতেই জাতির পিতার সাফল্য অর্জন সহজ হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সহধর্মিনী এবং মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা সবসময় পাশে ছিলেন বলে জাতির পিতার সাফল্য অর্জন সহজ হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু ছাত্র জীবন নয়, রাজনৈতিক জীবনেও তিনি সবসময় তাঁর বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার বাবার সাফল্য যদি আপনারা দেখেন, সেই ছাত্র জীবন থেকে ‘মা’ পাশে থাকাতে তাঁর জীবন কিন্তু সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে।’
প্রধানমন্ত্রী আজ সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯৩ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক-২০২৩ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
তিনি বলেন, বঙ্গমাতা শুধু নিজের সংসারই চালাতেন না, হাতে যা টাকা-পয়সা আসতো তাও বাবার রাজনীতির জন্য তাঁকে দিয়ে দিতেন। জাতির পিতার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আব্বা-আম্মা ছাড়াও সবসময় রেণু (বঙ্গমাতা) আমাকে কিছু টাকা পয়সা দিয়েছে। রেণু যা কিছু জোগাড় করতো বাড়ি গেলে এবং দরকার হলেই আমাকে দিত, কোনদিন আপত্তি করেনি। নিজে মোটেই খরচ করতো না, গ্রামের বাড়িতে থাকতো। আমার জন্য সব রাখতো।’
‘এই ভাবে তিনি আমার বাবার পাশে থেকে তাঁকে সবরকমের সহযোগিতা দিয়েছেন,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাবা যখন বি এ পরীক্ষা দেন কলকাতায় তখন দাঙ্গা হচ্ছিল। তাঁর বাবা দাঙ্গা দমনে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু সে সময় তাঁর ‘মা’ চলে আসেন তাঁর বাবার লেখাপড়ার সহযোগিতা করার জন্য।
তাঁর অনেক আত্মীয়ই সে সময়ে কলকাতায় থাকতেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন তাঁর মা’র ধারণা হয়েছিল, তিনি যদি তাঁর বাবার পাশে থাকেন বাবা লেখাপড়া করবেন এবং পাস করবেন, যা করেছিলেনও তিনি। এটাও জাতির পিতা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখে গেছেন।
সরকার প্রধান বলেন, শুধু ছাত্র জীবন থেকে নয় রাজনৈতিক জীবনে তিনি সবসময় আমার বাবার পাশে ছিলেন।
বঙ্গমাতা জাতির পিতাকে বলতেন, ‘রাজনীতি করো আমার আপত্তি নেই, কিন্তু পড়াশোনা করতে হবে,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দাদাও বলেছিলেন ‘যে কাজই করো তোমাকে পড়াশোনা করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর বাবা টানা দুই বছর কখনো জেলের বাইরে না থাকলেও তাঁর মা সব সময় ঘর-সংসার সামাল দিতেন এবং কখনো হতাশ হননি।
প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক ৬ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানসহ জাতির বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে বঙ্গমাতার ঐতিহাসিক সময়োচিত পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা লাভের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা এদিন অনুষ্ঠানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ চার বিশিষ্ট নারী ও জাতীয় নারী ফুটবল দলের মধ্যে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক-২০২৩’ প্রদান করেন।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আটটি ক্ষেত্রে নারীদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর সর্বোচ্চ পাঁচজন নারীকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এরআগে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় নারী ফুটবল দল এবং চারজন বিশিষ্ট নারীকে এই বছরের পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করে।
খেলাধুলার ক্ষেত্রে সাফ ফুটবল-২০২২ এ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন জাতীয় নারী ফুটবল দল ছাড়াও আরও চার নারী এই পদক লাভ করেন। তারা হচ্ছেন-রাজনীতিতে অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন (মরণোত্তর), শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় নাসিমা জামান ববি ও অনিমা মুক্তি গোমেজ এবং গবেষণায় ডা. সেঁজুতি সাহা (মলিকুলার বায়োলজিস্ট)।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমা মোবারেক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বঙ্গমাতার জীবন ও কর্মকা-ের ওপর ভিত্তি করে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান বেগম চেমন আরা তৈয়ব।
পুরস্কার প্রাপ্তদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।
শুরুতে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আর্থিক অনুদান ও সেলাই মেশিন বিতরণ কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন। সারাদেশের ৪ হাজার ৫শ’ দুস্থ মহিলার মধ্যে সেলাই মেশিন এবং ৩ হাজার দুঃস্থ মহিলার প্রত্যেককে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার করে টাকা প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাবা রাজনীতি করেছেন, ‘মা’ সংসারসহ সব গুছিয়ে রেখেছেন। ছোটবেলা থেকে তিনি একটা মানবিক চরিত্র নিয়ে এবং দৃঢ়চেতা মনোবল নিয়ে গড়ে উঠেছেন। বাবার রাজনৈতিক কারণে জীবনের যে চড়াই উৎরাই, তা নিয়ে মাকে কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি। বাবার পাশে থেকে সব সময় সহযোগিতা করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, অন্য সাধারণ নারীদের মতো তাঁর ‘মা’ যদি বলতো, আজকে গয়না দাও, কালকে ফার্নিচার দাও, এটা ওটা দাও তাহলে জাতির পিতা হয়তো দেশ স্বাধীনের আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করতে এবং দেশটাই হয়তো স্বাধীন করতে পারতেন না।
সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনে এবং নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসনে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জীবনী চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং বঙ্গবন্ধুর নেপথ্যের সহচর হিসেবে তার সংগ্রামী জীবন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা রাজনৈতিক কারণে প্রায়ই কারাগারে বন্দি থাকতেন। সেই দুঃসময়ে তিনি হিমালয়ের মতো অবিচল থেকে একদিকে স্বামীর কারামুক্তিসহ আওয়ামী লীগ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে, সংসার, সন্তানদের লালন-পালন, শিক্ষাদান, বঙ্গবন্ধুকে প্রেরণা, শক্তি ও সাহস যুগিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামকে সঠিক লক্ষে নিয়ে যেতে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।

সেই ’৪৮ এ ভাষার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হবার পর ২৩ বছরের স্বাধীকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন করতে গিয়ে জাতির পিতা বহুবার কারাবরণ করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বয়সে বাবার হাত ধরে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়, তাঁদের সে সুযোগ হয়নি। একের পর এক মিথ্যা মামলা। সে সব নিয়ে উকিলের কাছে দৌড়ানো। সবকিছুই তাঁর মা’ করতেন। উপরন্তু জেলে যখন তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন তখন বলতেন, ‘ঘর-সংসার নিয়ে তোমার (বঙ্গবন্ধু) চিন্তা করতে হবে না, আমি দেখব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, এটাই ছিল জাতির পিতার মূল লক্ষ্য। এটা পৃথিবীর কেউ না জানলেও তাঁর ‘মা’ জানতেন। কারণ, বঙ্গমাতাকে জাতির পিতা সবকিছুই বলতেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিপক্ষে বেগম মুজিবের দৃঢ়চেতা অবস্থান বাংলার মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিল এবং তিনি এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জাতির পিতাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন।

‘আইয়ুব খান মামলা প্রত্যাহার করবে, সকলকে ছেড়ে দেবে। তারপর উনি যাবেন, মুক্ত মানুষ হিসেবে যাবেন। জনগণ সাথে আছে তাদের এই মামলা প্রত্যাহার করতে হবে,’ বঙ্গমাতাকে উদ্ধৃত করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পরবর্তীতে তুমুল আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান মামলা প্রত্যাহার করে সকলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। জনগণের সঙ্গে যদি তাঁর (বঙ্গমাতা) এই সংযোগ না থাকতো এবং তিনি শক্তভাবে হাল না ধরতেন তাহলে এই মামলা প্রত্যাহার হতো না।
সরকার প্রধান বলেন, এমনিভাবে জাতির পিতা কারাগারে থাকার সময় ৬ দফার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বঙ্গমাতা বলেছিলেন ‘৬-দফার একটি দাড়ি, কমা, সেমিকোলনও বদলাবে না।’
জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, যেটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ^ ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিলে ঠাঁই করে নিয়েছে সেই ভাষণ প্রদানের আগেও তাঁর মা’র পরামর্শ-‘তোমার মনে যেটা আসবে, সেটাই বলবে। কারণ, তুমি এ দেশের মানুষকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছ,’ তাঁর পরামর্শই নিয়েছিলেন জাতির পিতা।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি থেকে এবং পাকিস্তানে কারাবন্দি স্বামীর জীবন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা সত্ত্বেও তাঁর ‘মা’(বঙ্গমাতা) সীমাহীন ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় আবেগ আপ্লুত কন্ঠে স্মরণ করেন, মরনেও কিভাবে জাতির পিতার সঙ্গ ছাড়েননি বঙ্গমাতা।

 শেখ হাসিনা বলেন, ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট শত্রুরা আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করলো, বাবাকে মেরে ফেললো। মা বের হয়ে আসলেন। তারা বললেন, আপনি আমাদের সঙ্গে চলেন। মা বললেন, তোমরা যেহেতু তাকে মেরে ফেলেছো। আমাকেও গুলি করে মেরে ফেলো। আমি কোথাও যাবো না। জীবনের পাশাপাশি মরনেও আমার বাবার সঙ্গী হয়ে চলে গেছেন মা।

 

সূত্রঃ ৮ আগস্ট, ২০২৩ (বাসস)

সর্বশেষ পোষ্ট

এই ধরনের আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here